জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ও নারীবাদ বিষয়ক পর্যবেক্ষণ (Movement against Rape in Jahangirnagar University and Feminism related observation)   Leave a comment

“জাবির ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন কি নারীবাদী/নারীর আন্দোলন নয়?‍‍” শিরোনামটি দেখে একটু ধন্ধে পড়ে গিয়েছিলাম? আরে এটা শুধু নারীর আন্দোলন হবে কেন? এতে তো আমিও শরিক ছিলাম। তারপর আবার স্মৃতি হাতড়ে দেখলাম, ওটা শুরু করেছিল ছাত্রীরাই, প্রথম যে মিছিলটি সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ থেকে বের হয় তাতে তারাই ছিল সব, শুধু নৃবিজ্ঞান প্রথমবর্ষের ১২ জন ছাত্র বাদে, যাদের মধ্যে আমিও একজন। কোন ছাত্র তার উদ্যোগে শামিল ছিল কিনা জানা নেই; তবে মিছিলটি পুরনো কলা ভবন আর নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের দিকের রাস্তার মোড়ে এসে পৌছলে তাতে আরো কিছু ছাত্র যোগ দেয় যাদের মধ্যে ধর্ষক মানিক ও তার সহযোগীরাও ছিল। তখন নেতৃস্থানীয় ছাত্রীরা আমাদের মিছিল থেকে বেরিয়ে আলাদা হয়ে যেতে বলে । এমনকি এ পর্যায়েও ছাত্রের সংখ্যা ছাত্রীদের অর্ধেকও ছিল কিনা সন্দেহ। আন্দোলনের পুরো সময়টাতেই ছাত্রীদের সংখ্যাই ছিল বেশী। ছাত্রদের হলে মানিক গংদের হাতে পিটুনী খাবার একটা বড় ঝুঁকি ছিল কিন্তু সেটাই তাদের বিরত থাকার একমাত্র কারণ কিনা আমি নিশ্চিত নই। সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ে মানিকগং এত প্রতাপের সাথে বিরাজ করত এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও একশ্রেণীর শিক্ষক নেতাদের সাথে তাদের যে দহরম মহরম ছিল তাতে তারা হয়তো ভাবতেও পারেনি যে এদের কোন শাস্তি হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াও তাদের এ ধারণাকে আরো দৃঢ় করা ছাড়া অন্যকিছুর উপযোগী ছিলনা। অপরদিকে ছাত্রীদের জন্য এটা ছিল অনেকটা অস্তিত্বের প্রশ্ন; তারা সবাই ছিল সম্ভাব্য ঝুকিঁর মুখে। যাহোক, এটা মূলত ছাত্রীদেরই আন্দোলন ছিল যাতে ছাত্রদের বৃহত্তর অংশের যুক্ত হতে প্রায় সপ্তাহখানেক লেগে যায়। সে দিক থেকে এটাকে ছাত্রী বা নারীদের আন্দোলন বললে ভুল বলা হবেনা। ব্যক্তিগতভাবে আমি তখন চাইতাম এটা “ছাত্রী আন্দোলন”ই থাকুক, কারণ ভয় ছিল এটা “ছাত্র আন্দোলন” হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের মত রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে চলে যেতে পারে। সেটা হলে আন্দোলনের দলীয়করণের ফলে পথভ্রষ্ট হবার যেমন আশঙ্কা ছিল তেমনি শঙ্কিত ছিলাম তথাকথিত ‘ছাত্রনেতা’দের ব্যক্তিস্বার্থে আপোষ বা আন্দোলন বিক্রি করে দেবার ভয়ে। এমনকি দু-একবার আন্দোলনের নেত্রীদের বলেছিলামও তারা যাতে নেতৃত্ব ছাত্রদের হাতে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকে। ছাত্রীদের/নারীদের আন্দোলনে ছাত্ররা অংশ নিতেই পারে। কিন্তু তবুও একে শুধুমাত্র ছাত্রী আন্দোলন বলা ঠিক হবে কিনা? আমার মতে, শুধু ছাত্রী আন্দোলন বললে এতে দুটো ভুলের সম্ভাবনা থেকে যায়, প্রথমতঃ যারা এটা সম্পর্কে জানেনা তাদের এতে মনে হতে পারে যে এতে শুধু ছাত্রীরাই ছিল; পুরুষদের অংশগ্রহণ ছিলনা; দ্বিতীয়তঃ এতে মনে হতে পারে যে এতে পুরুষদের কোন সমর্থন ছিলনা; যা ভবিষ্যতে আমাদের সমাজের এ বিশেষ সময় সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে ভ্রান্ত ধারণা তৈরী করতে পারে। এর বাইরে তো- তাদের বিযুক্ত করা হচ্ছে পুরুষ অংশগ্রহণকারীদের এমন বঞ্চনাবোধের বিষয়টি আছেই। তবে একে ছাত্রী আন্দোলন বলা হলে উচিত হবে এ বক্তব্যটিকে স্পষ্ট করা যে এতে ছাত্রদের সমর্থন ও অংশগ্রহণ উভয়ই কি মাত্রায় ছিল। “ছাত্রীদের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন” আমার কাছে এর একটি পছন্দনীয় বিকল্প।

অন্যদিকে যদি দেখি যে- এটি নারীবাদী আন্দোলন কিনা? তাহলে দেখা যায় যে এটি নারীদের অধিকার, নিরাপত্তা, ধর্ষিত নারীদের অবস্থান ও তাদের সম্পর্কে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধিতা সম্পর্কিত একটি আন্দোলন কাজেই একে নারীবাদী আন্দোলন বলাটা যথাযথ। এতে নারী বা পুরুষ যেই অংশগ্রহণ করুক তাতে এর কোন রকমফের হবেনা। আর নারীবাদী হতে হলে যে শুধু নারীই হবে হবে এমন কোন শর্তও কেউ দেয়নি। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রেই নারীবাদী তকমাটা সাধারণতঃ জোটে; যদিও নারীবাদী আন্দোলন ও চিন্তাজগতে পুরুষের উপস্থিতি একেবারে ফেলনা নয়।

এখন প্রশ্ন আসে যে যারা এতে বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নিয়ে ছিল তারা নারীবাদী চেতনা থেকে তা করে ছিল কিনা? এর উত্তরে বলতে হয় একটা বড় অংশই সচেতনভাবে ‘নারীবাদী’ ভেবে তা করেনি। তাদের অনেকে, এমনকি বহু নারীও সম্ভবত নিজেদের এ আন্দোলনের ‘নারীবাদী চেতনার’ সাথে যুক্ত করতে চাইবেনা। যদিও সারসত্ত্বার দিক থেকে তা অবশ্যই নারীবাদী।

কিন্তু কেন একটি সারসত্ত্বার দিক থেকে নারীবাদী আন্দোলনে শরীক মানুষেরা নিজেকে প্রকাশ্যে এ চেতনা থেকে বিযুক্ত ভাববেন? কেন তারা যার জন্যে আন্দোলনে সামিল হতে পারেন সে চেতনাকে সচেতনভাবে ধারণ করতে বা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক? এটা কি নারীবাদ আর যৌন-অসংযম বা বহুগামীতাকে সমাথর্ক ভাবার জন্যে? “নারীর ইজ্জত রক্ষা করার পুরুষালী দায়িত্ব” পালন থেকে এতে যোগ দেবার জন্যে?   নাকি “ধষর্ণের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার রাজনৈতিক চেতনা” হীনতার জন্যে? নিশ্চিতভাবেই কিছু সংখ্যক মানুষ, যারা নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস করেনা, তারা উপরোক্ত দোষাবলীতে দুষ্ট, কিন্তু সবাই কি? সম্ভবত না।

ধর্ষণের দুটো দিক আছে, একটি লিঙ্গীয় দিক আরেকটি ন্যায়ের দিক বা মানবাধিকারের দিক। কেউ যদি একে ন্যায়ের দিক থেকে দেখে তার প্রতিবাদে শামিল হয় তবে তা তার রাজনৈতিক চেতনাহীনতা নয়, চেতনার ভিন্নতা মাত্র, কারণ এরও কেন্দ্রে আছে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন ও শ্রদ্ধা; এমনকি, “পুরুষালী দায়িত্বের মধ্যেও”। আর ধর্ষনের লিঙ্গীয় দিকটি নিয়ে আমি পরে আলোচনা করব।

ফিরে আসি অনেক মানুষের নিজেদের নারীবাদ থেকে দূরে রাখার প্রবণতায়, এটা কি শুধুই তাদের নারী বিদ্বেষ-প্রসূত? আমার মতে না; তাদের কে অনেক সময়ই ঠেলে দেয়া হয় ঐ অবস্থানে। এটা করা হয় স্থূল বর্গীকরণ ও সাধারণীকরণের মাধ্যমে। অনেক ‘নারীবাদীরা’ যদিও অন্যদের মনে করিয়ে দেন যে নারীবাদ কোন একক, সমসত্ব প্রপঞ্চ নয় কিন্তু তারা ভুলে যান অথবা স্বীকার করতে চাননা যে পুরুষ মাত্রেই কোন সমসত্ব, ক্লোন করা কোন প্রাণী বা রোবট নয়, যে সবাই একই চেতনা ও প্রবণতা সম্পন্ন হবে।  তারা বলার সময় স্থূলভাবে  সমস্ত পুরুষকেই নারী বিদ্বেষী, নিপীড়ক, ধর্ষকামী এক জীব হিসেবে উপস্থাপন করেন।  অন্যদিকে সেসব ‘নারীবাদী’র বক্তব্যে এটাও মনে হয় যে, যেসব মানুষ ‘নারীবাদের’ সমালোচনা করেন সেটা নানা মত-পথের সব নারীবাদী ধারারই বিরোধিতা এবং তা নারীবিদ্বেষ বা নারী অধিকার বিষয়ক রাজনৈতিক চেতনাহীনতা প্রসূত; যদিও এমনকি নারীবাদীদের এক ধারাই অন্য ধারার সমালোচনা করে থাকে।  আমার মতে ‘নারীবাদ’ বলতে জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশই “আমূল (র‌্যাডিক্যাল) নারীবাদী”দের উগ্র পুরুষ  বিরোধিতার কোন একটা রূপকে ধরে নেয় ও তার সাথে নিজেকে সম্পর্কিত করতে পারেনা।

এক ধরণের ‘নারীবাদী’দের আরেকটি স্থূলতা হলো নারী বনাম পুরষের একটি “বিপরীতাত্মক দ্বৈততা” তৈরী করা যেখানে নারী ও পুরুষ যে একই প্রজাতির প্রাণী, মানুষ প্রজাতিরই লিঙ্গীয় পার্থক্য এবং নারী পুরুষের অসমতা যে আসলে সামাজিক ও ক্ষমতার সম্পর্ক  তা হারিয়ে যেতে বসে। যেমন, বলা হয় নারী প্রকৃতি বান্ধব (ইকো ফেমিনিজম) পুরুষ নয়, পুরুষ ধর্ষকামী নারী নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। মনে হয় যেন পুরুষের নির্যাতক, আগ্রাসী চরিত্র যেন প্রায় জৈবিকভাবে নারীর বিরুদ্ধে নির্ধারিত আর নারী তার বিপরীত। নারী-পুরুষের লিঙ্গীয় সম্পর্ককে ক্ষমতার সম্পর্ক হিসেবে স্বীকার করলে এটা হবার কথা নয়, তখন তার (নারী বা পুরুষ) আচরণ নির্ধারিত হবে ক্ষমতার ভিত্তিতে। আর বাস্তবেও তাই হয়।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যুদ্ধপীড়িত সমাজগুলোতে দেখা গেছে ধর্ষণের শিকার মানুষের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পুরুষ। আল জাজিরা টিভির ইংরেজী সংবাদের সাম্পতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে বসনীয় যুদ্ধে ৭০ শতাংশ পুরুষ আগ্রাসনকারীদের (বিপক্ষ পুরুষ সৈনিক) দ্বারা নানা ধরনের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ব্রেকিং দ্যা সাইলেন্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশেও নারী কর্তৃক পুরুষ শিশুদের যৌন-অপব্যবহার কোন বিরল ঘটনা নয়। তাই নারী ও পুরুষের যৌনাকাঙ্খা পূরণের একই ধরণের তাড়ণা ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতায় পরিণত হয় ধর্ষণে, আর তা পুরুষের একক রাজত্বের কোন বিষয় নয়, যদিও সমাজে পুরুষাধিপত্তের কারণে আপাতদৃষ্টিতে তা মনে হতে পারে।

কাজেই নারীবাদীদের সাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দূরত্বের ক্ষেত্রে যতটা তাদের লিঙ্গীয় রাজনৈতিক চেতনার অভাব দায়ী, তার চেয়ে কম দায়ী নয় নারীবাদীদের নিজেদের নারীবাদী চিন্তার বৈচিত্র্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ, সামাজিক-ক্ষমতা সম্পকের্র স্বরূপ উপলদ্ধি ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যর্থতা।

Advertisements

Posted September 8, 2011 by Abu Ala in Politics, Rights

Tagged with , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: