নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন: আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিবিম্ব   Leave a comment


অনেক ঘোলা করার পর অবশেষে ——টি (চতুষ্পদ ভারবাহী প্রানীটি) জল খেল (আমি খুব দুঃখিত যে এমন নিরীহ, উপকারী একটি প্রাণীর উপমা দিতে হচ্ছে এমন একটি অস্বাস্থ্যকর বিষয়ে)। বহু নাটকীয়তার পর আ’লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে শামীম ওসমানকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিল। আমরা পত্র-পত্রিকাতে যা দেখেছি ও নারায়নগঞ্জবাসী আমাদের পরিচিতদের কাছ থেকে জেনেছি তা হলো- শামীম ওসমান নারায়নগঞ্জের চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা, যে কিনা জেলার আইনশৃংখলা বিষয়ক সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্যকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে যায়, হুমকি দেয় জেলার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার  সামনেই (যদিও ঐ সভায় সে কি পদমর্যাদায় বা কিভাবে উপস্থিত ছিল তাও প্রশ্নসাপেক্ষ, এবং তারপরও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি)। প্রায় সব সংবাদপত্রের খবর হচ্ছে নারায়নগঞ্জবাসী তার ভয়ে অত্যন্ত ভীত, কাজেই তার জনসমর্থন অত্যন্ত নীচুর কোঠায়। এটা শুধু পত্রিকার খবর নয়, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের উঁচু পর্যায়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে একই কথা বলা হয়েছে ; এমনকি আ’লীগের প্রাক-নির্বাচনী জরিপেও অন্যকোন ধরণের ফলাফল পাওয়া যায়নি। এই যার অবস্থা তাকে ছাড়া প্রার্থী করার মত অন্য কেউ কি গোটা নারায়ণগঞ্জ জেলায় নেই আ’লীগের মত দলে। না আছে, আইভী, সেলিনা হায়াৎ খান আইভী, সদ্য সাবেক মেয়র, শিক্ষিত, সজ্জন, যার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই, সর্বোপরি জনপ্রিয়, এতটাই যে শুধু জনগণ, আ’লীগের সাধারণ সদস্যই নয় বিরোধী দলের অনেক সমর্থনকারীও তার সমর্থক। শুধু কি তাই, এমনকি গোটা দেশই এ মুহুর্তে তার সহমর্মী। তার এ জনপ্রিয়তার কথা প্রতিদিন আসছে পত্রিকায়; নিশ্চিত হওয়া গেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদন আর দলীয় জরিপেও। তবে কোন অযোগ্যতা তাকে ঠেলে দিতে পারে তার নিজ দলীয় সমর্থনের বাইরে?
আসুন দেখা যাক তাদের অতীত অবদানের দিকে- আইভী মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিরোধীদলের প্রার্থী হিসেবে যখন আ’লীগ ক্ষমতার বাইরে। দলের সে দূর্দিনে শামীম ওসমান ছিলো ফেরারী, দেশের বাইরে। মেয়র হিসেবে বিএনপি জোট বা বর্তমান আ’লীগ জোট কোনটা ক্ষমতায় থাকাকালীনই আইভীর বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা যায়নি। আর বিগত সময় আ’লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ও বর্তমান মেয়াদে পলাতক অবস্থা থেকে ফেরার পর শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন শেষ নেই। অনুমান করা কঠিন নয় যে আ’লীগ ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই তাকে আবারও ফেরারী হতে হবে; দলের খারাপ সময়ে তাকে পাওয়া যাবেনা। এটাই শেষ নয়, গত মেয়াদে আ’লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় এর বদনাম ও জনপ্রিয়তা হারানোর জন্য যে ক’জন ব্যক্তি বা তাদের কর্মকান্ডকে কৃতিত্ব দিতে হয় তাদের মধ্যে হাজারী, তাহের, নসিবুন্নেসার পুত্রদের পাশাপাশি শামীম ও সমান দাবীদার। আর এ মেয়াদে সে ইতোমধ্যে বাকীদের ও নিজের অতীত অবদানকে ছাড়িয়ে গেছে।
এ যদি হয় অবস্থা তবে আমরা কি বুঝবো? বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেতে হলে, দলে মূল্যায়িত হতে হলে কি কি যোগ্যতা থাকতে হবে? কোন কোন অবদানকে, যোগ্যতাকে দল সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়? আমাদের কাছে যে নজীরগুলো আ’লীগ উপহার দিয়েছে ও দিচ্ছে তা থেকে মনে হচ্ছে – যে ক্ষমতায় থাকাকালে দলকে ডোবাতে পারে, তার বদনাম করতে পারে, তার জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামাতে পারে; আর দূর্দিনে কোন কাজে আসেনা সেই বেশী আদরণীয়; শুধু তার পেশী শক্তি, সন্ত্রাসী, টাকা, আর দলের মধ্যে  কিছু ক্ষমতাধর বন্ধু থাকতে হবে। এ বিশ্লেষণকে যদি কেউ অলীক কল্পনা বলে ভুল প্রমাণ করতে চান তাকে স্ম^রণ করিয়ে দিচ্ছি- তাহেরের ঐ খুনী পুত্রটিকে তার অবদানের জন্য ক’দিন আগেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদান করা হয়েছে দেশে বিপুল প্রতিবাদ আর নিন্দা সত্ত্বেও।
এটা প্রমাণ করে যে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সম্পূর্ণ নৈতিকতা বর্জিত, জন বিচ্ছিন্ন, এমনকি গণবিরোধী। তারা শুধু জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্খা সম্পর্কে উদাসীনই নয় বরং তা জানার পরও তার বিরুদ্ধে যেতে পরোয়া করেনা। আর এর দায়ভার দলের শীর্ষ পর্যায়েই বর্তায়। কেউ যদি ভাবেন যে এটা শুধু আ’লীগের চরিত্র তবে ভুল করবেন, এটা সবার চরিত্র- খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীণ সন্ত্রাসী টোকাই সাগরের মৃতদেহে পূষ্পার্ঘ দিতে গিয়েছিলেন। আর জামাত তো যুদ্ধাপরাধীদের দল, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এরশাদের জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসের কথাও আমরা ভুলিনি।
তারপরও মানুষ কেন এদের সমর্থন করে? আ’লীগ কিছু সমর্থন পায় তারা অতীতে যে স্বাধীনতার জন্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অবদান রেখেছিলো তার জন্য আর অনেকের তাদের প্রতি ভ্রান্ত ধারণার জন্য যে তারা প্রগতিশীল, জন-বান্ধব, গণতান্ত্রিক দল। বিএনপি’র সমর্থনের পেছনে আছে আ’লীগের স্বাধীনতা পরবর্তী কর্মকান্ডে বিরক্ত মানুষ-জন ও স্বাধীনতা বিরোধীদের মিলিত স্রোত।  আর সুবিধাবাদীরা তো সব রাজনৈতিক দলের পেছনেই সমানভাবে আছে। এসবের সাথে আমাদের প্রথাগত গোষ্ঠীতান্ত্রিক মনোভাব, বংশপ্রীতি ও ব্যক্তিপূজা যোগ হয়ে টিকিয়ে রেখেছে এ দলগুলোর সমর্থন। আর দলগুলো ও এর নেতারা তাই ভাবে যে তারা যাই করুকনা কেন, তাদের সমর্থন অটুট থাকবে, তাদের বিকল্প নেই।
আশার কথা হচ্ছে, হাওয়া পাল্টাতে শুরু করেছে- আমাদের তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা আন্দোলন, কানসাট, ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ, আড়িয়াল বিলের আন্দোলন দেখায় যে মানুষ তার স্বার্থ রক্ষায় এক হতে, দলীয় সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠতে পারছে। এটা নারায়ণগঞ্জেও দৃশ্যমান- আইভী শুধু সাধারণ জনগণ আর আ’লীগ কর্মীদেরই সমর্থন পাচ্ছেনা, পাচ্ছে বিএনপি সমর্থকদের সমর্থনও। এর একটি কারণ হলো দুটো দলই তাদের প্রার্থী হিসেবে সৎ, জনগনের কাছের ও জন-বান্ধব প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার জনপ্রিয়তা বাড়ার ও তা নারায়ণগঞ্জ ছাড়িয়ে সাড়া দেশে ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি কারণ হলো শামীম ও তার মত সন্ত্রাসীদের প্রতি মানুষের অসীম ঘৃণা। আমার প্রায় সকল সহকর্মী সংবাদটি দেখা মাত্রই অত্যন্ত বিতৃষ্ণার সাথে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে তারা সামনের নির্বাচনে আ’লীগকে আর ভোট দিবেননা। আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখছি আইভীর পাশে তরুণ কর্মীদের ভীড়, এরাই বিগত নির্বাচনে আ’লীগকে জিতিয়ে ছিল। এরাই ভবিষ্যতের শক্তি। তারা এখন স্পষ্টতঃ আ’লীগের উপর বিরক্ত।
এরপরও যদি আ’লীগ নেতৃত্ব শিক্ষা না নেয়- না শোধরায়; রাজনৈতিক আত্মহত্যা করতে চায়, তবে তাই তাদের নিয়তি।

Advertisements

Posted October 19, 2011 by Abu Ala in Politics

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: