আমার সাম্প্রতিক রেল ভ্রমণ ও আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা   Leave a comment

কয়েকদিন আগে আমি ময়মনসিংহ থেকে গফরগাঁও যাচ্ছিলাম; অভিজ্ঞজনেরা আমাকে রেলগাড়িতে যেতে বললো- বাস ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা এতই খারাপ যে রেল ছাড়া বস্তুত আর কোন উপায় নেই। তাই বহু বছর পর আবার রেলগাড়িতে চড়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমি সকাল ৮.৪০ এর আন্ত:নগর ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসে যাবো ঠিক করলাম। যথা সময়ে ময়মনসিংহ স্টেশনে উপস্থিত হয়ে জানতে পারলাম সব আসনের টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে, দাঁড়িয়ে যেতে হবে, উপায়ন্তর না দেখে দাঁড়ানো টিকিটই নিলাম। তারপর গাড়ির অপেক্ষায় হাঁটাহাটি শুরু করলাম। এক জায়গায় দেখলাম একজন মাঝ-বয়সী মানুষ টলমল অবস্থায় বসে আছে, মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম অসুস্থ কিনা, কোন উত্তর দিতে পারলোনা, পাশের হকাররা বললো সে অজ্ঞান পার্টির শিকার।_MG_8839

আমি গিয়ে রেলওয়ে পুলিসের একজন সদস্যকে পেয়ে তার কথা জানালাম, ভদ্রলোককে বেশ সহৃদয়ই মনে হলো, আমার কথা শুনে সাথে সাথে আসল , লোকটিকে ধরে কিছু বস্তার গায়ে হেলান দিয়ে বসাল। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করে বুঝার চেষ্টা করল তার বাড়ি কোথায়, ফোন নম্বর বলতে পারবে কিনা, ইত্যাদি। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে যেহেতু তার সাথে কেউ নেই তাই লোকটিকে কিভাবে দ্রুত চিকিৎসা দেয়া যায়। তিনি জানালেন যে স্টেশন মাস্টার একটা “ডিও লেটার” দিলে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে জরুরী চিকিৎসা দেয়া যাবে। তিনি গেলেন স্টেশন মাস্টারের খোঁজে, আমি দাঁড়িয়ে রইলাম লোকটির কাছে। তিনি ফিরে এসে জানালেন স্টেশন মাস্টার তখনো আসেনি, অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বললেন আচার খাওয়ালে কিছুটা উপকার হয়, আমি আচার এনে দিলাম, তিনি খাওয়ালেন, কিন্তু তাতে কোন ফল দেখতে পেলামনা। আমরা দাড়িয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে বলতে জানলাম প্রায় প্রতিদিনই কয়েকটা করে এ ঘটনা ঘটে, বেশীরভাগ শিকার নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত, এ ঘটনা বেড়ে চললেও এর প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা নেই, রেল পুলিশের সংখ্যা এত কম আর তাদের কাজের সুযোগ-সুবিধা এত কম যে তাদের পক্ষে এটা ঠেকানো অসম্ভব। নিয়মিত এমনটা ঘটলেও অসুস্থ মানুষদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া বা এমনকি একটু শোয়ানোর ব্যবস্থাও কোন স্টেশনে নেই। স্টেশন মাস্টারের “ডিও লেটার” নিয়ে যে হাসপাতালে নিয়ে  যেতে হয় তার খরচ, এমনকি ঔষধের টাকাও তাদের নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, তাই ঘন ঘন এ ঘটনা ঘটলে তারাও রোগীকে হাসপাতালে নেয়ায় আগ্রহ হারায়। এ সময় তার কাছে ফোন আসে যে এক উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা যাবেন বলে স্টেশনে এসেছেন, তাকে অভ্যর্থনা করতে হবে, তিনি ছুটে গেলেন। সোয়া ন’ টা পার হয়ে গেলেও গাড়ি কখন আসবে তা কেউ জানেনা, আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি কিছুক্ষণ পর আবার এসে জানালেন স্টেশন মাস্টার আসেনি; এ সময় তিনি এক হকারকে বললেন যে, তারা মাত্র দু’জন পুলিশ কর্তব্য পালন করছেন তাই তার পক্ষে হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব নয়, সে যেন একটু অজ্ঞান লোকটিকে নিয়ে যায়, হকার রাজি হয় যদিও এতে যে তার আগ্রহ নেই তা বোঝাই যাচ্ছিল। অবশেষে পৌনে দশটায় গাড়ি আসে আমি দ্রুত তাতে উঠে পড়ি, চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতে পাই মানুষটি তখনো বস্তায় হেলান দিয়ে পড়ে আছে, যে এদেশের একজন নাগরিক, ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করে, যার করের পয়সায় সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্র চলে।

_MG_8826

ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের ভেতরে বেশ কিছু আসন না পাওয়া যাত্রী দাড়িয়ে ছিল, আর দু’জনের আসনে তিন জন করে বসে অনেক আসন ছাড়া যাত্রীরই বসার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। আমি যে আসনের পাশে দাড়িয়ে ছিলাম তার দুই যাত্রীর কথায় মনে হলো তারা রেলের কর্মকর্তা; জানতে পারলাম তাদের একজন স্টেশন মাস্টার। তার সাথে গণ্প জমে উঠল, তিনি জানালেন- ওবায়দুল কাদের সাহেব মন্ত্রী থাকাকালে রেলের সময়সূচি ঠিক ছিল, অন্যান্য দিকেও উন্নতি হচ্ছিল; মন্ত্রীর নিজের আগ্রহ ছিল, চেষ্টা ছিল, তিনি নিজে যখন-তখন পরিদর্শনে যেতেন, অবহেলা দেখলে ব্যবস্থা নিতেন। তার পরে যে দায়িত্ব নিয়েছে তার সে আগ্রহ ও চেষ্টা নেই তাই সব আগের দূর্দশাতেই ফিরে যাচ্ছে। রেল যোগাযোগ দশকের পর দশক অবহেলিত হয়েছে, ফলে এর নিজস্ব যে মান নিয়ন্ত্রণ ও পরির্শন ব্যবস্থা ছিল তা ভেঙে পড়েছে। এক দশকেরও বেশী সময় ধরে কোন জনবল নিয়োগ হয়নি ফলে জনবলের অভাবে অনেক স্টেশন বন্ধ করে দিতে হয়েছে, অন্যান্য সব কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । বর্তমানে যদিও জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাদেরও প্রশিক্ষিত হতে, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সময় লাগবে ফলে দেরী হবে রেলের সেবা উন্নত হতেও। অনেক স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগে যেখানে দশ মিনিট পর পর বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে “ক্রসিং” দেয়া  যেত, এখন একটি গাড়িকে আধাঘন্টা বা তার চেয়ে বেশী সময় কোন কোন স্টেশনে বসে থাকতে হয় অন্য গাড়িকে পার হবার সুযোগ দেয়ার জন্য, কারণ রেল লাইন একটি। ফলে গাড়ির গন্তব্যে পৌছতে দেরী হয়, সময়সূচীর বিপর্যয় ঘটে। রেলে দীর্ঘদিন কোন বিনিয়োগ হয়নি, তাই ইঞ্জিন ও বগির ব্যাপক সংকট, অবকাঠামোর উন্নতি তো হয়ইনি বরং অবনতি হয়েছে, অন্যদিকে দিনে দিনে মানুষের সংখ্যা আর চাহিদা দুই’ই বেড়েছে। তিনি বলেন, রেল এখনো যথেষ্ঠ পরিমাণে আয় করে, এটা আরো বাড়ানো সম্ভব যদি দূর্নীতি রোধ করা যায়। তবে রেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা এর আয়ে নয়, ব্যয়ে; রেলের যারা বড় বড় ক্রয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের দূর্ণীতি বন্ধ করা গেলে রেল এখনো লাভজনক হবে, এর সেবার মানও বাড়বে। এর জন্য দরকার উদ্যোগ, পরিকল্পনা আর কিছুটা কর্তব্য নিষ্ঠা।

তার কথা শুনে আমার মনে পড়ল যে গত কয়েক দশক ধরে অবকাঠামো উন্নয়ন আর শিল্পায়নের যে ব্যাবস্থাপত্র বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ গং দিয়ে আসছে তাতে সব সময়ই রেলকে বাদ দেয়া হয়েছে আর জোর দেয়া হয়েছে সড়ক পথের উপর। সমালোচকরা বলেন যে সড়ক পথের নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ সবই ব্যয়বহুল, এতে পরিবহন খরচও বেশী তবুও এর কদর কারণ কিছু অসৎ ব্যবসায়ী আর রাজনৈতিক নেতা এ থেকে লাভ করতে পারে। আর এসব ব্যবসায়িক স্বার্থ বিশ্বব্যাংক গংদের সাথে একই সুতায় গাঁথা।

সৌভাগ্যক্রমে অনেক দেরীতে হলেও সরকার সম্প্রতি কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এটা চালু থাকবে, জোরদার হবে, এটাই এখন কাম্য; কারণ এদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ভবিষ্যত সড়ক নয় রেল আর নৌ পথেই।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: