তত্ত্বাবধায়কের রাজনীতি ও গণতন্ত্র   Leave a comment

অতি সম্প্রতি একটি আলোচনা শুরু হয়েছে আমাদের সরকার পরিবর্তনের পদ্ধতি বা সে সময়ের শাসন ব্যবস্থা নিয়ে; টিভির কিছু নিয়মিত ‘প্যাচাল অনুষ্ঠান‌’ এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে কেন আমরা একটি স্থায়ী ব্যবস্থার দিকে না গিয়ে বারবার একটি অস্থায়ী ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি আর প্রতি পাঁচ বছর পর পর একটি সংকট তৈরী করছি, অযথা প্রাণহাণী ঘটাচ্ছি ও অর্থনীতির বারোটা বাজাচ্ছি। তাদের বক্তব্য হলো আমরা স্বল্পমেয়াদী সমাধান পছন্দ করি । শুনে বেশ মজা পাচ্ছি । কারণ এতদিন সবাই তথাকথিত “তত্ত্বাবধায়ক সরকার” বিষয়ক আলোচনার বেড়াজালেই ঘুরপাক খাচ্ছিলেন। আমি ফখরুদ্দিনের ছদ্মবেশী সামরিক শাসন শুরু হবার সময় থেকেই বলে আসছি যে, তখনই ওটা মরে গেছে, ওটার দাফন সম্ভব, পুনর্জন্ম নয় । বিগত এক দশকের অভিজ্ঞতার পর তা না ভাবলে যে কারো মস্তিষ্কের যৌক্তিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে । আর খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক “তত্ত্বাবধায়ক সরকার” ফমূর্লা এর অবাস্তবতা ও অসাড়তাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। তার পরও কেন “তত্ত্বাবধায়ক সরকার” নিয়ে এত সব ধুন্ধুমার কান্ড-কারখানা হলো ও হচ্ছে তা কি শুধু “আমরা স্বল্পমেয়াদী সমাধান পছন্দ করি‍” বলে? আর করলেও কেন করি? এর উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এ সমস্যার কারণ ও সমাধান। আমাদের পেশাদার রাজনীতিকারীরা (ও তাদের সাথে যে খন্ডকালীনরা আছে) জানে বর্তমান প্রধান দুই দলের বাইরে আর যে সব দল আছে তাদের তৃতীয় শক্তি হয়ে উঠার কোন সম্ভাবনা নেই, কারণ সেসব দলও কোন ভাবেই এ দুটোর থেকে আলাদা নয়, কোন কোনটি বরং আরো বেশী খারাপ; উপরস্তু সেসব দলের নেতারা বড় দল দুটোর উচ্ছিষ্টভোগীর ভুমিকাতেই সন্তুষ্ট। তারা আরো জানে এদেশের বেশীরভাগ মানুষের রাজনৈতিক আনুগত্য উত্তরাধিকার ভিত্তিক ও বংশানুক্রমিক, যা সুদীর্ঘ সামন্তবাদী প্রথারই ধারাবাহিকতা। এখানে চাপিয়ে দেয়া পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী ধারার কোনটিই তেমন শিকড় গেড়ে উঠতে পারেনি এখনো, একই কথা সত্য ‍‘গণতন্ত্রের’ ক্ষেত্রেও, যা তাত্ত্বিকভাবে ঐ দুটো ধারারই মূল কথা। ‘চাপিয়ে দেয়া (পুজিঁবাদী) গণতন্ত্রের ধারণা’ যেসব দেশ থেকে আমদানীকৃত তা সেখানে যে ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে তা না ঘটায় সে ব্যবস্থা কাজ করার পেছনে যে সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো দরকার তা এখানে গড়ে উঠেনি। কাজেই, বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক আনুগত্য মতাদর্শিক বা নেতাদের কর্মের মূল্যায়নের ভিত্তিতে না হয়ে হয় ক্লাবের সমর্থনের মত আবেগ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্ভর অথবা উত্তরাধিকার সূত্রীয়; আর এর সাথে যোগ হয় স্থানীয় ক্ষমতার প্রতিযোগিতা। এর ভিত্তিতে তারা মনে করে যে তারা যাই করুক না কেন ভোটের সময় বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সময় তাদের সমর্থকরা তাদেরই সমর্থন করবে। আর তারা প্রায় পুরোপুরি সঠিক; যদিও প্রধানতঃ শিক্ষিত শহুরে শ্রেণীর মধ্যে এর সামান্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। তারা আরো জানে দেশের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বেশীরভাগ কর্মচারী সক্রিয় বা সুপ্তভাবে দু’দলের সমর্থনে বিভক্ত। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের সমর্থকদের দাপট একটু বেশী থাকে; তবে পটপরিবর্তনকালীন সময়ে সবাই নিজ নিজ পছন্দের দলের পক্ষে কাজ করে। আর সংখ্যার হিসেবেও তারা প্রায় সমান-সমান। এছাড়া তারা এটাও জানে দলের সমর্থকদের বাইরে যারা আছে তাদের ভোট পাওয়ার মত কোন জন কল্যাণমূলক ভুমিকা বিরোধী দলে থাকতে তারা রাখে না; সরকারে থাকা দলের ক্ষমতার অপব্যবহার, দূর্নীতি আর সন্ত্রাসের কারণে এসব  মানুষ তাদের উপর তুলনামূলকভাবে বেশী বিরক্ত থাকে ও তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেয়; বিকল্প কিছু না থাকায় সেসব পায় বিরোধী দল। আর এ কারণেই না ভোটের সুযোগটি তুলে দিতে সরকারী দলের চেয়ে বিরোধীদের উৎসাহ কোন অংশে কম ছিলনা। মোদ্দাকথা হলো যেহেতু তারা কেউই জনগণকে সন্তষ্ট করার মত কিছু করেনা বলে নিজেরা ভালভাবেই জানে তাই তারা কোন মতেই নির্বাচনের ফলাফল জনগণের ইচ্ছার হাতে ছেড়ে দিতে চায়না; চায় ছলে বলে কৌশলে তা নিজের পক্ষে নিতে; আর সেটা হাসিল করতে জনগণের জান-মাল, নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা কিছুরই তোয়াক্কা করেনা। যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্টু হয়  তবে তা প্রভাবিত করার সুযোগ থাকেনা আর ফলাফল জনগণের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পরে; যা কোন দলই চায়না। কিন্তু এর সাথে “তত্ত্বাবধায়ক সরকার” বা “স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান” এর সম্পর্ক কি? বিএনপি চায় “তত্ত্বাবধায়ক সরকার” যা কে বলা হচ্ছে “স্বল্পমেয়াদী সমাধান”। বিএনপি এটা চায় কারণ এতে তাদের তিনটি উদ্দেশ্য পূরণ হয়- প্রথমতঃ তারা দেখাতে পারে যে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বাধ্য করেছে তাদের দাবী মানতে, যা জনগণের কাছে তাদের অধিক শক্তিশালী দল হিসেবে তুলে ধরবে সরকারী দলের দূর্বল চেহারার বিপরীতে; দ্বিতীয়তঃ সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের যে সমর্থকরা আছে তারা নির্বাচন প্রভাবিত করতে অধিক ভুমিকা রাখতে পারবে; আর তৃতীয়তঃ সরকারী দলের নির্বাচন প্রভাবিত করার বেশীরভাগ পথই যে বন্ধ করা যাবে তাই নয়, তাদের কোনঠাসাও করা যাবে। এটা যদি তারা শুধু নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য চাইতো তবে, তাদের লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা যাতে কোন কারচুপি হতে না পারে; কার অধীনে নির্বাচন হবে তা নয় কারণ এরই মধ্যে এটা প্রমাণিত হয়েই গেছে যে এখন তথাকথিত “নিরপেক্ষ ব্যক্তি” পাওয়া অসম্ভব আর তেমন কাউকে পাওয়া গেলেও নির্বাচনে পরাজিত দল পরে তাদের পক্ষপাতিত্বের দায়ে অভিযুক্ত করবে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিএনপি’র জয় প্রমাণ করে সরকারী দলের উপর জনগণ যথেষ্ঠ বিরক্ত তাই সে ভোটগুলো বিরোধীরা পেয়েছে। পাশাপাশি এটাও প্রমাণ হয়েছে কোন দল ক্ষমতায় থাকলেও যথাযথ নজরদারীর মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। আর আওয়ামীলীগ চায় ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে যাতে তারা প্রশাসনকে তাদের মত করে সাজিয়ে, তাদের সমর্থকদের ব্যবহার করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে; তাদের সংবিধান বা গণতন্ত্র প্রীতির কারণে নয়। এখন যদি আমরা দেখি “দীর্ঘমেয়াদী সমাধান” কি? তবে দেখব যে সারা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ই নির্বাচিত সরকারের অধীনে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হয়। তারা নির্ভর করে ‘ব্যবস্থার’ দক্ষতার উপর ব্যক্তির সততা নয়। আমাদের দেশে আশংকা হলো যে নির্বাচন কমিশনের কর্তারা সরকারের মনোনীত তাই তারা পক্ষপাতিত্ব করবে- কিন্তু তাদের ও পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষন করার জন্য দেশে শক্তিশালী গণমাধ্যম আছে, আছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও; সর্বোপরি, ডিজিটাল ক্যামেরাসহ মোবাইল ফোনের সর্বব্যাপী উপস্থিতি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবল প্রসারে নির্বাচনে কোন লক্ষ্যণীয় অনিয়ম করে পার পাওয়া দৃশ্যতঃ খুবই কঠিন কাজ। এর উপর আছে এনজিও কর্তৃক সবল নির্বাচন পর্যবেক্ষন ব্যবস্থা। এখন মানুষের সচেতনতাও বেড়েছে; বিরোধী দলের কারচুপির অভিযোগ যদি সত্য হয় তবে কোন দলই ক্ষমতায় থাকতে পারবেনা। আওয়ামীলীগের একটি প্রস্তাবে সরকারীদলের নির্বাচন প্রভাবিত করার পথ বন্ধ করার আরেকটি সুযোগ এসেছিল- সর্বদলীয় সরকারে বিরোধীদল কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নিজেদের জন্য বরাদ্দ নিতে পারতো যা সরকারী দলের প্রশাসনকে ব্যবহার কার্যতঃ অসম্ভব করে তুলতো। এমনকি যদি দু’পক্ষ সত্যিই যদি নিরপেক্ষ নির্বাচনে আগ্রহী হতো তবে আগে থেকেই গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগও পারষ্পারিক আলোচনা ও সম্মতির ভিত্তিতে করা যেতো যা নির্বাচন কমিশনকে অধিক নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে কাজ করতে সক্ষম করে তুলতো। পাশাপাশি নির্বাচন ব্যবস্থার পদ্ধতিগত সংষ্কারের মাধ্যমে একে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে কারচুপির সুযোগ ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব ছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অতীতে যে সরকারই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে তারা বিরোধীদের শত অভিযোগ সত্ত্বেও তাদের মেয়াদ পূর্ণ করেছে আর কোন সরকারই অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে কয়েক মাসও টিকতে পারেনি। এটা আমাদের জনগনের শক্তিরই প্রমাণ, গণতন্ত্রের হাজারো দূর্বলতা সত্ত্বেও। বিএনপি এর উপর আস্থা রেখে নির্বাচন ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার পথে আগাতে পারতো। কিন্তু তা না করে এর অপব্যবহার করতে চাচ্ছে আওয়ামীলীগকে একতরফা, অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে ঠেলে দিয়ে তাদের ক্ষমতা থেকে হটাতে। যার ফলে তাদের (বিএনপি’র) নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে আমাদের নির্বাচন তথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার যে সুযোগ আওয়ামীলীগ অনিচ্ছা সত্ত্বেও দিতে বাধ্য হয়েছে তা বিএনপি নষ্ট করছে সচেতনভাবেই । কারণ আমাদের রাজনীতির পেশাদাররা  জনগণের রায় চায়না, তারা চায় নির্বাচন কারসাজির মাধ্যমে যে কোন প্রকারে ক্ষমতায় যেতে আর “স্বল্পমেয়াদী সমাধান”কে এজন্য তারা  সুবিধাজনক মনে করে।

(লেখাটি মাসখানেক আগে লেখা, সংবাদপত্রে ছাপানোর জন্য, কিন্তু মনে হয় সম্পাদকের পছন্দ হয়নি। আলসেমী করে আর কিছু করা হয়নি। মনে হলো এর প্রসঙ্গিকতা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি তাই এখানে তুলে দিলাম)
Advertisements

Posted December 12, 2013 by Abu Ala in Politics

Tagged with , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: