জলে কুমির-ডাঙায় বাঘঃ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে ভাবনা   1 comment

আমি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক জটিল আদর্শিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক হেয়ালীতে/দ্বন্দ্বে আছি।

আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আমার আশৈশব রাজনৈতিক-আদর্শিক শিক্ষা ছিল সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, মানুষের প্রতি সম্মান আর শান্তির উপর ভিত্তি করে। আমার পরিবার আমার ধর্মশিক্ষার উপর যথেষ্ট যত্নবান ছিলো, আমিও শৈশবে ছিলাম বেশ ধর্মপ্রাণ; কিন্তু তা কখনোই আমার অন্য ধর্মের বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সাথে মিশতে বাধা হয়নি। প্রতিবেশীর পুজোর অনুষ্ঠানে যাওয়া, তাদের নিজেদের উৎসব-পরবে আমন্ত্রণ করা এসবে আমাদের যথেষ্ট উৎসাহ ছিল। ছাত্রজীবনে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না থাকলেও সক্রিয় ছিলাম সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা আন্দোলনে সক্রিয়তার পাশাপাশি তৎকালীন ছাত্রলীগের গুন্ডাদের বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ করে হল ছাড়াও হয়েছি।

আমি কখনোই আওয়ামীলীগ বা বিএনপি’র ভক্ত ছিলামনা । রাজনৈতিক দল হিসাবে বা তাদের নেতা-কর্মীদের আচরণ সাধারণতঃ বিরক্তিই উৎপাদন করতো, এখনো তাই। আমি সম্ভবত ঐ দলের যারা স্বপ্ন দেখতো বা দেখে: দেশে কিছু রাজনৈতিক দল তৈরী হবে যারা জনগণের স্বার্থ, আশা-আকাঙ্খা মাথায় রেখে কাজ করবে, জনগণ ও জনমতকে শ্রদ্ধা করবে। যারা সরকারেই থাকুক আর বিরোধীদলে, সর্বদা দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। আমি এখন পর্যন্ত খুব আশাবাদী হবার মত কিছু খুজেঁ পাচ্ছিনা। এমন অবস্থায়- দেশে সরকারের মেয়াদ শেষ কিন্তু এক সরকার থেকে পরবর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া কি হবে তা নিয়ে চলছে মতানৈক্য, অব্যবস্থাপনা আর অরাজকতা; বর্তমান সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের দূর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত, তাদের গুন্ডামী-অপরাধপ্রবণতা দল ও সরকারের জনপ্রিয়তা নষ্ট করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকেও সরকার নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে বলে অনেকের অভিযোগ, পাশাপাশি ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার জন্য তারা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে বা এ সরকারের অধীনে সুষ্টু নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম, এমন বিশ্বাস জনগণের একটি বড় অংশের। বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দমন-পীড়নও অসন্তুষ্টি তৈরী করেছে অনেকের মধ্যে। কাজেই এ মুহুর্তে তাদের পছন্দ করার মত বেশী কিছু নেই। দূর্ভাগ্যজনকভাবে সম্ভাব্য বিকল্প হলো প্রধান বিরোধীদল যাদের সীমাহীন দূর্নীতি, যুদ্ধপরাধী-রাজাকার জামাত-শিবিরের সাথে সম্পৃক্ততা, জঙ্গীবাদে মদদ, অন্যধর্ম ও জাতির জনগণের প্রতি নিপীড়ণে সমর্থন ক্ষমতাসীনদলকে বিগত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা পেতে সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছিল। তারা ভোটে জনগণের রায়ে শোচণীয় ভাবে পরাজিত হবার পরও এমন কিছুই করেনি যা থেকে মনে হতে পারে তারা তাদের অতীত অপরাধ বা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে (এটা আওয়ামীলীগের জন্যও সমান সত্য)। বরং তারা সংসদে অনুপস্থিত থেকেও যাবতীয় সরকারী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বাচানোর জন্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাঙ্খার বিরুদ্ধে গিয়ে জামাত-শিবিরকে সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং জনগণের বিরুদ্ধে তাদের সহিংসতায় অংশ নিয়েছে। সবশেষে, রাস্তায় বোমা মেরে, বাসে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে, রেললাইন খুলে রেখে গাড়ি ফেলে মানুষ হত্যা করে,রাস্তা-ব্রিজ, সরকারী অফিস সহ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে চাইছে সরকারের প্রতি মানুষকে ক্ষেপিয়ে দিতে বা একে বেকায়দায় ফেলতে। পাশাপাশি, তারা যেভাবে এখনি জামাত-শিবিরের সাথে মিলে সরকারী দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা করছে, অন্যধর্ম ও জাতির সদস্য ও সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ-অত্যাচার করছে তা ২০০১ সালে নির্বাচন পরবর্তী তাদের সহিংসতা-নির্যাতনকে শুধু মনে করিয়েই দিচ্ছেনা বরং তা ইতিমধ্যেই বহুগুনে ছাড়িয়ে গেছে।

আমার সমস্যা হলো- আমি চাইনা একতরফা নির্বাচন হোক, আমি চাইনা আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় গিয়ে তাদের দূর্নীতি চালু রাখার সুযোগ পাক। কিন্তু, বিএনপি ছাড়া আর যে সব দল আছে তাদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী, খুনী, ধর্ষক, অন্যধর্ম ও জাতির জনগণের উপর অত্যাচারকারী, ধর্ম-ব্যবসায়ী, প্রতারক জামাত-শিবিরকে তো সমর্থনের প্রশ্নই আসেনা (বরং আমি এ দল ও এর সব সদস্যের এ দেশে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে জোর দাবী জানাই); ব্যক্তিত্বহীন, অসৎ, পতিত স্বৈরাচার এরশাদও বিবেচনায় আনার যোগ্য নয়। আর যে সব “আওয়ামী” বা “জাতীয়তাবাদী” জোটের নানান লেবাস ও কিসিমের ‘গৃহপালিত’ নাম-সর্বস্ব দলগুলো আছে সেগুলো বড় বড় কথা বললেও নিজেরা সামান্য সুযোগ পেলেও কতটা অসৎ হতে পারে তা তো এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি। আর আমরা গত কয়েক বছরে যে সব তাত্ত্বিক সম্ভাবনা বিচার করছিলাম- ‘সুশীল সমাজ’, গরীবের রক্তচোষা ছ্যাবলা ধান্দাবাজ ‘ইউনুস সমাজ’, অবসরপ্রাপ্ত দূর্নীতিবাজ ও সাবেক সব সরকারের পা-চাটা ‘আমলা সমাজ’, কোনটাই যে আমাদের কোন আশা দেয়ার মত কিছু না তাও প্রমাণিত। তাই শেষ পর্যন্ত অবস্থা যা দাঁড়ায় তাতে আমার বেছে নিতে হয় জলের কুমির বিএনপি আর ডাঙার বাঘ আওয়ামীলীগের মধ্য থেকে কোন একটাকেই।

আর আওয়ামীলীগ বা বিএনপি’র যেটাকেই বেছে নিই সম্ভবতঃ এর গুন্ডাদের দৌরাত্ম আরও বাড়বে, দূর্নীতি বাড়বে, পরিবারতন্ত্র পোক্ত হবে, বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-পীড়ন বাড়বে, যারা জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তাদের কাজ আরও কঠিন হবে কারণ চলমান সহিংসতা ঠেকাতে বা এ থেকে জনগণ ও সম্পদ রক্ষা করতে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যে আক্রমনাত্বক আচরণ রপ্ত করছে তার ঝাঁঝ তাদের সইতে হবে।(আমি নিজেকেও শীঘ্রই তাদের মাঝে সে ঝাঁঝের মুখে খুজেঁ পাব বলে আশা করছি।) মোটকথা মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের যে ধারা গত কিছু দিন যাবৎ গড়ে উঠছিল, তা আরো কঠিন হয়ে যাবে আশঙ্কা করছি। আমি জনগণের স্বার্থ, দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আদর্শ বা নৈতিকতার ক্ষেত্রেও এ দুটো দলের মাঝে খুব বেশী পার্থক্য দেখি না।

কিন্তু একটা জায়গায় আমি পার্থক্য দেখি, প্রথমতঃ বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করে আসছে আর জামাতের প্রতি যে তীব্র ভালবাসা দেখাচ্ছে তাতে তাদের বেছে নিলে তারা জামাত-শিবিরকে ক্ষমতার অংশীদার করবে, জামাত-শিবিরের শক্তি আরো বাড়বে, তারা মন্ত্রী-এমপি হবে, পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ হবে, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ও প্রগতিশীল মানুষদের তারা দমন করার চেষ্টা করবে। সুপ্রিম কোর্টে বিএনপির নেতৃস্থানীয় আইনজীবীরা এরই মধ্যে ঘৃণিত রাজাকার কাদের মোল্লার গায়েবানা জানাজা পড়েছে, এমনকি তাকে ‘শহীদ’ বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামীলীগ জামাতের সাথে কখনো ক্ষমতা ভাগাভাগী করেনি, তাদের বিরুদ্ধে জামাতের সাথে আতাঁত করে কম শাস্তি দেয়ার ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ ছিল কাদের মোল্লার ফাঁসির মাধ্যমে তারা তা কিছুটা হালকা করতে পেরেছে। দ্বিতীয়তঃ ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী ও সাম্প্রতিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা আমাকে দেশের অন্য ধর্ম ও জাতি এবং অন্য দলের মানুষদের জন্য বিএনপিকে বেশী বিপজ্জনক ভাবতে বাধ্য করছে। অন্যধর্ম ও জাতির সদস্য, অন্য দল ও সাধারণ মানুষের উপর তারা এখনি যেমন আক্রমণ-অত্যাচার করছে তাতে তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কেউ জানেনা। আর এর সাথে জামাত-শিবিরের অপরাধীদের যোগ করলে তা অত্যন্ত ভয়ংকর চিত্রই তুলে ধরে। এটা এ আশঙ্কাকেও বাড়িয়ে তোলে যে তারা- অধিকার ও ন্যায়ের জন্য যারা কথা বলবে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, মুক্তচিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার চর্চা করবে তাদের জন্য বেশী বিপজ্জনক হবে।

জলের কুমির আর ডাঙার বাঘ এর মধ্য থেকে বেছে নেবার প্রশ্ন হলেও আমার পক্ষে সম্ভব নয় এদেশের সাথে, একে স্বাধীন করতে আমাদের যে পূর্বসূরীরা রক্ত দিয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন, তাদের সাথে বেঈমানী করা। আমার পক্ষে সম্ভব নয় স্বাধীনতা বিরোধী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী, রাজাকারদের পক্ষ নেয়া কাউকে সমর্থন করা । আমার পক্ষে সম্ভব নয় নিরপরাধ সাধারণ মানুষ হত্যাকারীদের, তাদের উপর আক্রমণ কারীদের সমর্থন করা। আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামাত-শিবিরের বিলুপ্তি দেখতে চাই; কারণ আমি সহিংসতার রাজনীতির অবসান চাই। তাই কেউ যদি সন্ত্রাসী-রাজাকার জামাত-শিবিরকেই আপন ও মূল্যবান ভাবে, আর নেতিবাচক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারা অব্যাহত রাখে, আমার কাছে তার কোন স্থান নেই।

ভাবছেন আমার মত এমন আম-জনতার পছন্দ-অপছন্দে কি আসে যায়? এটা ঘটা করে বলার কি আছে? আছে , কারণ আমি একা নই, আমার মত মানুষের সংখ্যা এদেশে কম নয়।

Advertisements

One response to “জলে কুমির-ডাঙায় বাঘঃ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে ভাবনা

Subscribe to comments with RSS.

  1. পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে কিছু প্রতিনিধি (http://tribune.com.pk/story/646260/abdul-quader-molla-was-innocent-imran-khan/)কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ ই পাকিস্তান’ বলেছে; বাংলাদেশের জামাতী-বিএনপি আইন ব্যাবসায়ীদের কথার সাথে কি আশ্চর্য মিল, যারা আরো দ্রূত তা বলেছে; এটা কি কোন যোগাযোগের ঈঙ্গিতবাহী? আর জামাতী-বিএনপি জোটের বর্তমান রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শন আমাদের পাকিস্তানের কথাই মনে করিয়ে দেয় (http://www.dhakatribune.com/op-ed/2013/dec/21/bnp-still-democratic-party)। বিএনপি কি জামাতের কবল মুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের জাতীয় সম্মান রাখতে পারবে? নিজেদের সম্মান রক্ষা করতে পারবে? তা হলে তো আমরা বেচে যেতাম—-

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: