Archive for June 2016

একটি রাজনৈতিক দলের আত্মহত্যা প্রচেষ্টা ও গণতন্ত্রের সংকট   Leave a comment

(এ লেখাটি গত ৮ জুন বনিকবার্তা’য় ছাপা হয়েছে; সেখান থেকে তুলে দিলাম)

গত ২৮ মে ত্রিশাল থেকে যখন ‘অটো’তে করে গফরগাঁওয়ের আত্মীয় বাড়ি যাচ্ছিলাম, তখন সহযাত্রীদের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কথা উঠল; তারা গফরগাঁওয়ের রসুলপুর ইউনিয়নের ভোটার; তাদের নির্বাচন নিয়ে বেশি উত্সাহী মনে হলো না। কারণ হিসেবে তারা জানাল এবারে নির্বাচন হচ্ছে মূলত কাউন্সিলর পদে, চেয়ারম্যান হবে স্থানীয় এমপি যাকে মনোনয়ন দিয়েছে সে। জোর গুজব চেয়ারম্যান পদে ভোট দিতে হবে সবার সামনে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীকে অথবা ফলাফল বদলে দেয়া হবে উপজেলা সদরে। তাদের মতে, আগের চেয়ারম্যান মইন সরকার আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও বিদ্রোহী প্রার্থী, তাকে সমর্থন করে ৯০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু সে কোনো প্রচারণা চালাতে পারছেন না, তার সমর্থকদের আওয়ামী লীগ তথা এমপি মনোনীত প্রার্থীর কর্মীরা মারধর করছে; সংঘর্ষ হচ্ছে দুপক্ষের মধ্যে, যা তাদের এলাকায় আগে দেখা যায়নি। ‘এমপি মনোনীত আওয়ামী লীগারদের’ হামলা-নির্যাতনে বাইরে বের হতে পারছে না বাকি আওয়ামী লীগাররা। আরেকটু এগোতেই পড়ল বারবারিয়া ইউনিয়ন, সেখানকার আগের চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন তিন-তিনবার নির্বাচিত, ছাত্রলীগের রাজনীতি করে উঠে আসা, তুমুল জনপ্রিয়, কিন্তু তিনিও এমপির মনোনয়ন পাননি, তাই দলের প্রার্থী হতে পারেননি। সহযাত্রীদের মতে, মানুষ যদি কোনোমতে তাদের ভোট দিতে পারে তবে সে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবে আর এমপি মনোনীত আওয়ামী লীগদলীয় প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার শঙ্কা বেশি। এমপি মনোনীত প্রার্থী উপজেলায় ‘খাইয়ালা কাশেম’ নামে পরিচিত তার সর্বভুক অর্থলিপ্সার জন্য। কিন্তু এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও পুরনো পরীক্ষিত নেতারা কেন দলের মনোনয়ন পেল না— জানতে চাইলে তারা জানাল, উপজেলার কোনো পুরনো জনপ্রিয় নেতাই এবার মনোনয়ন পাননি; পেয়েছে ভুইফোঁড় আর কুখ্যাত সব ব্যক্তি। স্থানীয় এমপি মনোনয়ন দিয়েছে টাকার বিনিময়ে, মোটা অঙ্কের টাকা। আর এসব অর্বাচীন প্রার্থীদের নির্বাচনে পাশ করাতে সে ও তার চেলারা কায়েম করেছে ত্রাসের রাজত্ব। কর্মীরা ভোট চাইতে পারছেন না, মাইকে প্রচারণা চালাতে পারছেন না, সে নিজেও গণসংযোগ করতে পারছেন না। আমি নিজ চোখেই দেখলাম যাত্রাপথে কোথাও কোনো বিদ্রোহী প্রার্থীর পোস্টার চোখে পড়ল না, যেখানে নৌকার পোস্টারে পুরো এলাকা সয়লাব।

যাহোক, আত্মীয় বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম, সেখানেও এল নির্বাচন প্রসঙ্গ, তারা আজীবনের একনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ সমর্থক, কিন্তু এবার কোনো মতেই ‘আওয়ামী লীগ মনোনীত’ প্রার্থীকে ভোট দেবে না। তারা অত্যন্ত বিরক্ত যে, সারা উপজেলায় সব ‘গুণ্ডা-বদমাস’দের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে ঘুষ নিয়ে। আর তারা ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে, মানুষকে নির্যাতন করছে। প্রশাসন হয় নীরব দর্শক, না হয় এসবে সক্রিয় সহযোগী। বাড়ির শিশুরাও, যারা আগে বড়দের দেখাদেখি আওয়ামী লীগের গুণগানে মুখর থাকত, তারাও ‘মনোনীত আওয়ামী লীগারদের’ বুঝাতে এমনভাবে ‘আওয়ামী লীগ’, ‘আওয়ামী লীগ’ করছিল যে, আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম এটা কি ‘জাত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের’ বাড়ি না অন্য কারো।

আওয়ামী লীগ যখন দলীয় মনোনয়নে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দিল, তখনই আমি আশঙ্কা করেছিলাম যে, এতে স্থানীয় নেতারা তাদের পছন্দের লোকদের মনোনয়ন দেবে দলে তাদের অবদান আর জনপ্রিয়তার তোয়াক্কা না করেই; হবে মনোনয়ন বাণিজ্য; তাতে দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী বঞ্চিত হবে, অসন্তুষ্ট হবে আর দল হবে দুর্বল। কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গেই লক্ষ করলাম আমার আশঙ্কার চেয়েও পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপ- এ মনোনয়ন পদ্ধতি আসলে দলের স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরনের জায়গিরদারি প্রথা চালু করেছে মূলত এমপিকে কেন্দ্র করে, যেখানে তাকে নজরানা না দিয়ে, তার ধামাধরা না হয়ে দলে টিকে থাকা অসম্ভব। এমনকি ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও। আর প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা বিরোধিতার তো প্রশ্নই ওঠে না। বর্তমান অবস্থায় দলের বেশির ভাগ কর্মী-সমর্থক শুধু অসন্তুষ্টই নন বরং ‘এমপি মনোনীত আওয়ামী লীগার’ দ্বারা নির্যাতিত। ফলে তারা ক্রমে নিজ দলের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এমপি-মন্ত্রীদের পোষা কিছু গুণ্ডা ছাড়া আওয়ামী লীগের কর্মী খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। শুধু তাই নয়, এটা তাদের সমর্থকদেরও দলের প্রতি বিরূপ করে তুলছে। আওয়ামী লীগের প্রথাগত বংশানুক্রমিক সমর্থক গোষ্ঠী দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়ার হুমকির সম্মুখীন। গ্রামের মানুষের কাছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন একটি বড় উত্সব, যা থেকে আওয়ামী লীগ তাদের বঞ্চিত করছে; এটা তারা ভালোভাবে নিচ্ছে না, যেমন নিচ্ছে না তাদের ভোটের অধিকার খর্ব করাকে। আর এটা এমন একসময়ে ঘটছে, যখন ধানের অতি কম দামের জন্য কৃষকরা এরই মধ্যে নাখোশ। এটি যেন আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টা।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার ভয় পাওয়ার পরিসর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের চেয়েও অনেক ব্যাপক। বিএনপি তার দুই রাজনৈতিক ভুল- অতি জামাতপ্রিয়তা বা নির্ভরতা ও অতিদ্রুত নির্বাচনের বিকল্প পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টায় এবং সরকারি দলের দমন কৌশলের কারণে জীর্ণ, দিশেহারা; তাদের গুছিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। আর এখন আওয়ামী লীগের গণভিত্তি, স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামো ও জনসমর্থন হুমকির মুখে; তারা প্রথাগতভাবে যে সমর্থকগোষ্ঠীর একচ্ছত্র সমর্থন পেয়ে আসছিল, তা ক্ষয়িষ্ণু। গত দুদশকে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা মাত্র দুবছরে তারা প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে। নির্বাচনে সহিংসতা, সন্ত্রাস ফিরে এসেছে আগের চেয়েও ভয়াবহ রূপে; যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতিরও লক্ষণ। এাট নিশ্চিতভাবেই সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সহিংসতা উসকে দেবে আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আইনের শাসনের অবস্থা আরো খারাপ হবে। দেশে ক্রমবর্ধমান মৌলবাদের (পড়ুন আমূলবাদের/ radicalization) বিস্তার আর জঙ্গি তত্পরতার প্রেক্ষাপটে জনগণ যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারায় (বর্তমান পরিস্থিতিতে যা অবশ্যম্ভাবী বলেই মনে হচ্ছে, কারণ দলগুলোর ওপর আস্থার জায়গা আর খুব একটা বাকি নেই) তবে তা যে ওই দলগুলোর ধ্বংসই ডেকে আনবে, তা নয় বরং দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হবে, মৌলবাদী, অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে বলবান হওয়ার, প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেবে, যা কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। আর তা যদি ঘটে তবে এর জন্য দায়ী হবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, তাদের অপরিণামদর্শী কার্যকলাপ, ক্ষমতার লোভ ও দম্ভ।

সূত্রঃ

http://bonikbarta.com/news/2016-06-08/76850/%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%88%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%A6%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%9A%E0%A7%87%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%97%E0%A6%A3%E0%A6%A4%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%95%E0%A6%9F/

Advertisements

Posted June 18, 2016 by Abu Ala in Uncategorized