Archive for the ‘party politics’ Tag

সন্ত্রাসী আন্দোলন ও আমরা   Leave a comment

কাল সন্ধ্যায় একটি পরিবেশবাদী সংগঠনে সভা শেষে ফিরছিলাম – একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকনেতা আমাকে রাস্তায় নামিয়ে দেবেন বলে তাদের গাড়িতে উঠালেন, সোবহানবাগ মসজিদের কাছে পৌছলে রাস্তায় গাড়ির ভিড় প্রায় থেমে ছিল, এমন সময় শব্দ হলো তাকিয়ে দেখলাম সামনের গাড়িতে ধোয়া, একজন হেলমেট পরা লোক সরে যাবার চেষ্টা করছে – মনে হলো পুলিশ বা বিজিবি সদস্য; সাথে সাথে আরেকটি শব্দ মনে হলো এবার আমাদের গাড়িতেই – সৌভাগ্যবশতঃ তা হয়নি, তবে সামনের গাড়িতে আগুন ধরে গেল; আমরা সবাই অত্যন্ত আতঙ্কিত ছিলাম; চালক দ্রুত সেখান থেকে সরে যেতে পারল; আমরা কিছুটা স্বস্তি পেলাম যদিও পুরো আশ্বস্ত নয় যে নিরাপদ হতে পেরেছি। আমার বিএনপিপন্থী সহযাত্রীরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন, তারা নিরাপত্তাহীনতায় শঙ্কা প্রকাশ করছিলেন, এমনও বলছিলেন যে যদি আমরা আহত হতাম তাহলে কি হতো ? – পত্রিকায় সংবাদ হতো নিশ্চিত; দল থেকে সরকারকে দোষ দেয়া হতো, সরকারী দল দোষ দিত বিরোধী দলকে; কেউ বলতো উচি‌ত শিক্ষা হয়েছে বিএনপি সমর্থকদের, কেউ হয়তো এমনো বলতো যে তারাই বোমাবাজি করতে গিয়েছিল—। আমি ভাবছিলাম আমার ক্ষেত্রে কি হতো – আমাকেও হয়তো কোন দলের কর্মী-সমর্থক দাবী করা হতো- যদিও আমি কোন কালেই তা নই – তারপর কেউ কোন দায়িত্ব নিত না – আমার যন্ত্রণা আমাকেই বইতে হতো -। আমার সহযাত্রীদের অবস্থা আমার কাছে অস্পষ্ট মনে হলো – তারা তাদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল ঠিকই তবে যেহেতু নিজ দলীয় লোকেরাই তা করেছে তাই কোন দলকে তারা দোষারোপ করতে না পেরে সমালোচনা করছিল সাধারণভাবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে, ক্ষমতার লোভকে। আমি নিশ্চিত তারাও আমার মতই একই রকম অপছন্দ করেছে ব্যাপারটি; একই রকম নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেছে; কিন্তু তারা কখনো দলীয় পর্যায়ে এমন আন্দোলনের পন্থার বিরোধিতা করবেনা বা করতে পারবেনা। যেমন পারিনা আমরা — আর এভাবেই আমরা জিম্মি হয়ে থাকবো রাজনৈতিক নেতা নামধারী গুটিকয় অসৎ-অপরাধীর — যতক্ষণ না আমরা তাদের দেখাতে পারি আসল ক্ষমতা কার হাতে- তাদের না আমাদের – জনগণের; সেজন্যে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় আসতে হবে – কোন দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয় বরং বিষয় ভিত্তিক দাবী নিয়ে — আমারা কি নিজেদের জন্য এটুকু করতে পারিনা ??

জলে কুমির-ডাঙায় বাঘঃ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে ভাবনা   1 comment

আমি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক জটিল আদর্শিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক হেয়ালীতে/দ্বন্দ্বে আছি।

আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আমার আশৈশব রাজনৈতিক-আদর্শিক শিক্ষা ছিল সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, মানুষের প্রতি সম্মান আর শান্তির উপর ভিত্তি করে। আমার পরিবার আমার ধর্মশিক্ষার উপর যথেষ্ট যত্নবান ছিলো, আমিও শৈশবে ছিলাম বেশ ধর্মপ্রাণ; কিন্তু তা কখনোই আমার অন্য ধর্মের বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সাথে মিশতে বাধা হয়নি। প্রতিবেশীর পুজোর অনুষ্ঠানে যাওয়া, তাদের নিজেদের উৎসব-পরবে আমন্ত্রণ করা এসবে আমাদের যথেষ্ট উৎসাহ ছিল। ছাত্রজীবনে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না থাকলেও সক্রিয় ছিলাম সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা আন্দোলনে সক্রিয়তার পাশাপাশি তৎকালীন ছাত্রলীগের গুন্ডাদের বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ করে হল ছাড়াও হয়েছি।

আমি কখনোই আওয়ামীলীগ বা বিএনপি’র ভক্ত ছিলামনা । রাজনৈতিক দল হিসাবে বা তাদের নেতা-কর্মীদের আচরণ সাধারণতঃ বিরক্তিই উৎপাদন করতো, এখনো তাই। আমি সম্ভবত ঐ দলের যারা স্বপ্ন দেখতো বা দেখে: দেশে কিছু রাজনৈতিক দল তৈরী হবে যারা জনগণের স্বার্থ, আশা-আকাঙ্খা মাথায় রেখে কাজ করবে, জনগণ ও জনমতকে শ্রদ্ধা করবে। যারা সরকারেই থাকুক আর বিরোধীদলে, সর্বদা দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। আমি এখন পর্যন্ত খুব আশাবাদী হবার মত কিছু খুজেঁ পাচ্ছিনা। এমন অবস্থায়- দেশে সরকারের মেয়াদ শেষ কিন্তু এক সরকার থেকে পরবর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া কি হবে তা নিয়ে চলছে মতানৈক্য, অব্যবস্থাপনা আর অরাজকতা; বর্তমান সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের দূর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত, তাদের গুন্ডামী-অপরাধপ্রবণতা দল ও সরকারের জনপ্রিয়তা নষ্ট করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকেও সরকার নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে বলে অনেকের অভিযোগ, পাশাপাশি ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার জন্য তারা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে বা এ সরকারের অধীনে সুষ্টু নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম, এমন বিশ্বাস জনগণের একটি বড় অংশের। বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দমন-পীড়নও অসন্তুষ্টি তৈরী করেছে অনেকের মধ্যে। কাজেই এ মুহুর্তে তাদের পছন্দ করার মত বেশী কিছু নেই। দূর্ভাগ্যজনকভাবে সম্ভাব্য বিকল্প হলো প্রধান বিরোধীদল যাদের সীমাহীন দূর্নীতি, যুদ্ধপরাধী-রাজাকার জামাত-শিবিরের সাথে সম্পৃক্ততা, জঙ্গীবাদে মদদ, অন্যধর্ম ও জাতির জনগণের প্রতি নিপীড়ণে সমর্থন ক্ষমতাসীনদলকে বিগত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা পেতে সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছিল। তারা ভোটে জনগণের রায়ে শোচণীয় ভাবে পরাজিত হবার পরও এমন কিছুই করেনি যা থেকে মনে হতে পারে তারা তাদের অতীত অপরাধ বা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে (এটা আওয়ামীলীগের জন্যও সমান সত্য)। বরং তারা সংসদে অনুপস্থিত থেকেও যাবতীয় সরকারী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বাচানোর জন্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাঙ্খার বিরুদ্ধে গিয়ে জামাত-শিবিরকে সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং জনগণের বিরুদ্ধে তাদের সহিংসতায় অংশ নিয়েছে। সবশেষে, রাস্তায় বোমা মেরে, বাসে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে, রেললাইন খুলে রেখে গাড়ি ফেলে মানুষ হত্যা করে,রাস্তা-ব্রিজ, সরকারী অফিস সহ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে চাইছে সরকারের প্রতি মানুষকে ক্ষেপিয়ে দিতে বা একে বেকায়দায় ফেলতে। পাশাপাশি, তারা যেভাবে এখনি জামাত-শিবিরের সাথে মিলে সরকারী দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা করছে, অন্যধর্ম ও জাতির সদস্য ও সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ-অত্যাচার করছে তা ২০০১ সালে নির্বাচন পরবর্তী তাদের সহিংসতা-নির্যাতনকে শুধু মনে করিয়েই দিচ্ছেনা বরং তা ইতিমধ্যেই বহুগুনে ছাড়িয়ে গেছে।

আমার সমস্যা হলো- আমি চাইনা একতরফা নির্বাচন হোক, আমি চাইনা আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় গিয়ে তাদের দূর্নীতি চালু রাখার সুযোগ পাক। কিন্তু, বিএনপি ছাড়া আর যে সব দল আছে তাদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী, খুনী, ধর্ষক, অন্যধর্ম ও জাতির জনগণের উপর অত্যাচারকারী, ধর্ম-ব্যবসায়ী, প্রতারক জামাত-শিবিরকে তো সমর্থনের প্রশ্নই আসেনা (বরং আমি এ দল ও এর সব সদস্যের এ দেশে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে জোর দাবী জানাই); ব্যক্তিত্বহীন, অসৎ, পতিত স্বৈরাচার এরশাদও বিবেচনায় আনার যোগ্য নয়। আর যে সব “আওয়ামী” বা “জাতীয়তাবাদী” জোটের নানান লেবাস ও কিসিমের ‘গৃহপালিত’ নাম-সর্বস্ব দলগুলো আছে সেগুলো বড় বড় কথা বললেও নিজেরা সামান্য সুযোগ পেলেও কতটা অসৎ হতে পারে তা তো এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি। আর আমরা গত কয়েক বছরে যে সব তাত্ত্বিক সম্ভাবনা বিচার করছিলাম- ‘সুশীল সমাজ’, গরীবের রক্তচোষা ছ্যাবলা ধান্দাবাজ ‘ইউনুস সমাজ’, অবসরপ্রাপ্ত দূর্নীতিবাজ ও সাবেক সব সরকারের পা-চাটা ‘আমলা সমাজ’, কোনটাই যে আমাদের কোন আশা দেয়ার মত কিছু না তাও প্রমাণিত। তাই শেষ পর্যন্ত অবস্থা যা দাঁড়ায় তাতে আমার বেছে নিতে হয় জলের কুমির বিএনপি আর ডাঙার বাঘ আওয়ামীলীগের মধ্য থেকে কোন একটাকেই।

আর আওয়ামীলীগ বা বিএনপি’র যেটাকেই বেছে নিই সম্ভবতঃ এর গুন্ডাদের দৌরাত্ম আরও বাড়বে, দূর্নীতি বাড়বে, পরিবারতন্ত্র পোক্ত হবে, বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-পীড়ন বাড়বে, যারা জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তাদের কাজ আরও কঠিন হবে কারণ চলমান সহিংসতা ঠেকাতে বা এ থেকে জনগণ ও সম্পদ রক্ষা করতে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যে আক্রমনাত্বক আচরণ রপ্ত করছে তার ঝাঁঝ তাদের সইতে হবে।(আমি নিজেকেও শীঘ্রই তাদের মাঝে সে ঝাঁঝের মুখে খুজেঁ পাব বলে আশা করছি।) মোটকথা মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের যে ধারা গত কিছু দিন যাবৎ গড়ে উঠছিল, তা আরো কঠিন হয়ে যাবে আশঙ্কা করছি। আমি জনগণের স্বার্থ, দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আদর্শ বা নৈতিকতার ক্ষেত্রেও এ দুটো দলের মাঝে খুব বেশী পার্থক্য দেখি না।

কিন্তু একটা জায়গায় আমি পার্থক্য দেখি, প্রথমতঃ বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করে আসছে আর জামাতের প্রতি যে তীব্র ভালবাসা দেখাচ্ছে তাতে তাদের বেছে নিলে তারা জামাত-শিবিরকে ক্ষমতার অংশীদার করবে, জামাত-শিবিরের শক্তি আরো বাড়বে, তারা মন্ত্রী-এমপি হবে, পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ হবে, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ও প্রগতিশীল মানুষদের তারা দমন করার চেষ্টা করবে। সুপ্রিম কোর্টে বিএনপির নেতৃস্থানীয় আইনজীবীরা এরই মধ্যে ঘৃণিত রাজাকার কাদের মোল্লার গায়েবানা জানাজা পড়েছে, এমনকি তাকে ‘শহীদ’ বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামীলীগ জামাতের সাথে কখনো ক্ষমতা ভাগাভাগী করেনি, তাদের বিরুদ্ধে জামাতের সাথে আতাঁত করে কম শাস্তি দেয়ার ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ ছিল কাদের মোল্লার ফাঁসির মাধ্যমে তারা তা কিছুটা হালকা করতে পেরেছে। দ্বিতীয়তঃ ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী ও সাম্প্রতিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা আমাকে দেশের অন্য ধর্ম ও জাতি এবং অন্য দলের মানুষদের জন্য বিএনপিকে বেশী বিপজ্জনক ভাবতে বাধ্য করছে। অন্যধর্ম ও জাতির সদস্য, অন্য দল ও সাধারণ মানুষের উপর তারা এখনি যেমন আক্রমণ-অত্যাচার করছে তাতে তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কেউ জানেনা। আর এর সাথে জামাত-শিবিরের অপরাধীদের যোগ করলে তা অত্যন্ত ভয়ংকর চিত্রই তুলে ধরে। এটা এ আশঙ্কাকেও বাড়িয়ে তোলে যে তারা- অধিকার ও ন্যায়ের জন্য যারা কথা বলবে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, মুক্তচিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার চর্চা করবে তাদের জন্য বেশী বিপজ্জনক হবে।

জলের কুমির আর ডাঙার বাঘ এর মধ্য থেকে বেছে নেবার প্রশ্ন হলেও আমার পক্ষে সম্ভব নয় এদেশের সাথে, একে স্বাধীন করতে আমাদের যে পূর্বসূরীরা রক্ত দিয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন, তাদের সাথে বেঈমানী করা। আমার পক্ষে সম্ভব নয় স্বাধীনতা বিরোধী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী, রাজাকারদের পক্ষ নেয়া কাউকে সমর্থন করা । আমার পক্ষে সম্ভব নয় নিরপরাধ সাধারণ মানুষ হত্যাকারীদের, তাদের উপর আক্রমণ কারীদের সমর্থন করা। আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামাত-শিবিরের বিলুপ্তি দেখতে চাই; কারণ আমি সহিংসতার রাজনীতির অবসান চাই। তাই কেউ যদি সন্ত্রাসী-রাজাকার জামাত-শিবিরকেই আপন ও মূল্যবান ভাবে, আর নেতিবাচক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারা অব্যাহত রাখে, আমার কাছে তার কোন স্থান নেই।

ভাবছেন আমার মত এমন আম-জনতার পছন্দ-অপছন্দে কি আসে যায়? এটা ঘটা করে বলার কি আছে? আছে , কারণ আমি একা নই, আমার মত মানুষের সংখ্যা এদেশে কম নয়।

প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতা ও আমাদের ভবিষ্যত   Leave a comment

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব তারানকো সাহেব এসে সপ্তাহব্যপী দুতিয়ালী করে বলে গেলেন প্রধান দুই দল সদিচ্ছা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে আলোচনা করলেই সমাধান সম্ভব। তার এ কথায় আমাদের টেলিভিশনের ‘প্যাচাল অনুষ্ঠানের’ নিয়মিত আলোচকরা উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন যে তারা যে কথা গত দু’বছর যাবৎ বলছেন তাই তো বললেন তারানকো সাহেব, এ আর নতুন কি? তারা দেশী আদমী বলে তাদের কথা সেভাবে পাতে তোলা হয়নি । কথাটা মিথ্যা না, তবে তার সাথে যোগ করে বলতে হয় যে তারা যেমন দিন শেষে নিজ নিজ গোয়ালে উঠেন আর অনুষ্ঠানেও দলের পাতে ঝোল টানেন, তারানকো সাহেব বোধ হয় তা করেননি। আর তিনি দুই পালের গোদাদের এক খাটালে কিছুক্ষণের জন্য জাবনা দিতে পেরেছিলেন যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলের নেত্রীকে ফোন করেও করতে পারেননি। মনে হয় এটা পুরনো অভ্যাস, ঔপনিবেশিক কাল থেকে এদের রাখালীতে অভ্যস্ত এদেশের রাজনীতির পান্ডারা রাখাল ছাড়া নিজেদের একটু অনিরাপদ মনে করে। যা হোক, জাতিসংঘের চাপে আর সাথে অন্য যে কোন কারণে হোক, আলোচনায় বসলেই কি এ অবস্থা থেকে পুরো জাতির মুক্তি পাবার কোন আশু সম্ভাবনা আছে কিনা?

এবার দেখা যাক আমাদের রাজনীতি বা রাজনীতির পান্ডাদের চরিত্র কেমন? সবচেয়ে বেশী দেখা গেছে যেভাবেই হোক যত বেশীদিন সম্ভব ক্ষমতায় থাকার প্রবণতা, অথবা অন্যভাবে বলতে গেলে ক্ষমতার বাইরে থাকার ভীতি। এর একটি কারণ যেমন ক্ষমতার দই-মিষ্টির লোভ তেমনি ক্ষমতাসীন দলের দমন-পিড়নের ভয়। রাজনীতির প্রধান দলগুলো এমন এক শত্রুতার আবহ তৈরী করেছে যে এমনকি তাদের পান্ডাদের মধ্যে পারষ্পারিক শ্রেণীগত বিয়ে-শাদী, ব্যবসা, ভাগ-বাটোয়ারার সম্পর্ক থাকার পরও কারো কারো জেল খাটতে হয়, দেশ ছাড়তে হয়, মামলা খেতে হয় বা পুলিশের প্যাদানী সইতে হয়। আর কয়েক বারের ক্ষমতা বদলের পালাক্রমে এসব শোধ-প্রতিশোধের হিসাব এত জমে গেছে যে এখন কেউই আর ক্ষমতা ছাড়তে চায়না। বাস্তবতা হলো যে একপক্ষই মসনদে থাকে, বাকিরা বাইরে কিন্তু এ বাস্তবতা মেনে নিতে যেন তাদের বড়ই আপত্তি। ক্ষমতা ছাড়া হলে যেন তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়, তারা যে কোন উপায়ে তা ফিরে পেতে প্রায় ‘ভাদ্র মাসের কুকুরের’ মত আচরণ করে, যেমনটা করে ক্ষমতাসীনরা টিকে থাকতে। এক্ষেত্রে তারা জনমত বা জন-সমর্থনের থোড়াই কেয়ার করে । তারা জন সমথর্ন আদায় বা জন-কল্যাণের কোন চেষ্টা না করে, করতে থাকে নানা ষড়যন্ত্র, কারসাজি (এ বিষয়ে আমার পূর্বের লেখায় ব্যাখ্যা আছে, দেখুন- http://wp.me/p1JhsE-3C)।  আর বর্তমান রাজনীতির পান্ডাদের মধ্যে জন-সম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মীর চেয়ে লুটেরা ব্যবসায়ী, দূর্নীতিবাজ সাবেক আমলা আর গুন্ডা, পেশাদার অপরাধীর সংখ্যাই বেশী, তারা যখন দলের নীতি নির্ধারণ প্রভাবিত করে তখন জনগণকে মনে করে বলির পাঠা, তাই জন-বিচ্ছিন্নতাও বাড়ছেই।

এমন অবস্থায় বিরোধীদল ক্ষমতায় যেতে বা সরকারী দলকে বিপদে ফেলতে রাস্তায় মানুষ পোড়ায়, বোমা মারে, রেললাইন খুলে রেখে গাড়ি ফেলে দিয়ে মানুষ হত্যা করে, যেগুলো কোন যুদ্ধাবস্থায়ও সাধারণত হয় না।তারপরও তারা কোন দূঃখ প্রকাশ করেনা, এসব থেকে বিরত থাকতে তাদের দলীয় ক্যাডারদের একটি বারও বলেনা, উল্টো নির্লজ্জভাবে বলে যে এসব করছে সরকারী দলের লোকেরা বা আরও ঔদ্ধত্ত দেখিয়ে বলে সরকার তাদের এসব করতে বাধ্য করছে। অন্যদিকে সরকারী দল বিরোধীদের সাথে সমঝোতা করতে, সংঘাতের অবসান ঘটাতে অথবা জনগণের শত্রু এসব অপরাধীদের ধরতে, শাস্তি দিতে, জনগণের নিরাপত্তা দিতে তেমন গা করেনা। হয়তো এ আশায় যে এতে জনসমর্থন তাদের দিকে ঝুঁকবে। এমনকি বিরোধীরা যদিও বলে ক্ষমতাসীন দল এসব করাচ্ছে তাদের উপর দায় চাপাতে, যখন ক্ষমতায় যায় তখন তারা এসবের কোন বিচার করেনা।উতোর-চাপান চলতেই থাকে কিন্তু দু’পক্ষই যেহেতু একই দোষে দোষী, কেউই এসব নিয়ে ঘাটায়না, কারণ সাধারণ জনগণের ভালমন্দ নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই আর ঘাটাঘাটি করলে নিজেদেরও ফেসেঁ যাবার ভয় আছে। এমন একটি অবস্থায়  ‘প্রধান দুই দলের সদিচ্ছা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতা’ কতটুকু আশা করা যায়? কিসের ভিত্তিতে?

এক্ষেত্রে আরেকটি বড় ‘গলার কাঁটা’ হলো জামাত-শিবির ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। প্রধান বিরোধীদলের সাথে তাদের গাটছড়ার কারণে নির্বাচনে নিষিদ্ধ এ দলটিকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচন বা সমঝোতায় কতটুকু আগ্রহী হবে তা একটি প্রশ্ন, আরেকটি প্রশ্ন হলো মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী যারা জামাতকে নেতৃত্ব দিত তাদের নিয়ে কি করা হবে তা বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কিভাবে প্রভাবিত করবে। অনেক ‘ওয়াকিবহাল’ মহল বলছেন যে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের দিক থেকে কিছুটা নমনীয়তা দেখানোর পরও সমঝোতার চেষ্টা আগাতে পারেনি কারণ এ মূহুর্তে বিএনপি নির্বাচনে, এমনকি ক্ষমতায়, যেতেও আগ্রহী নয় কারণ তাহলে তাদের এ কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে যেখানে হয় তাদের নিজেদের রাজনৈতিক সহযোগীদের ফাসিঁর দড়িতে ঝুলাতে হবে অথবা তা না করে দেশের বেশীরভাগ মানুষের রোষ সামাল দিতে হবে। তাই তারা চাচ্ছে সময় ক্ষেপন করতে যাতে কোন প্রকারে আওয়ামীলীগকে নতি স্বীকার করাতে পারে যাতে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পর যাই করুক প্রতিরোধের মুখে পড়তে না হয় আর মানুষকে আন্দোলন-প্রতিবাদে বিরক্ত, ক্লান্ত করে তোলা যায় যেন যুদ্ধাপরাধীদের সাজা না দিলেও প্রতিরোধ তেমন তীব্র না হয়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল জানে তাদের জন-সমর্থন সুবিধার না, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে গো-হারা হেরেছে, তার পর এমন কিছু করতে পারেনি যে তা বদলে যাবে, তাদের ভরসা তাদের ভোট ব্যাংক, আর যেন-তেন একটা নির্বাচন। বিরোধীদল না থাকলে তাদের সুবিধাই হয়।

এটা যদি সত্য হয়, তবে আমাদের রাজনীতির পান্ডাদের বেপরোয়া ক্ষমতার খায়েশ আর জনগণের প্রতি অবজ্ঞা-উপেক্ষার পাশাপাশি সন্ত্রাসী-যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবিরের প্রভাব যদি ক্ষমতার রাজনীতির এ হিসাবে যোগ হয় হবে ‘সদিচ্ছা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতা’র সন্ধান পাওয়া বেশ কঠিনই হবে।

তাহলে আমরা কি করবো? এ আশায় বসে থাকবো যে কবে পান্ডাদের চরিত্র বা মানসিকতা ভাল হবে? নাকি আমাদের কিছু করনীয় আছে?

আমাদের করনীয় অনেক কিছুই আছে, তবে প্রশ্ন হলো আমরা যেভাবে দু’গোয়ালে বিভক্ত তাতে আমরা তা করতে পারবো কিনা?

 

Posted December 15, 2013 by Abu Ala in Politics

Tagged with , , , , , ,